গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করুন: কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন
- 14 Sep 2024
- Best Doctor List
এখন ব্যস্ত জীবনে অনেকেই পাকস্থলীর নানা সমস্যায় ভুগছেন। অম্বল, গ্যাস, বদহজম যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু, এই সমস্যা গুলোকে আর উপেক্ষা করা যাবে না। কারণ, এগুলো আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মকে প্রভাবিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে পড়েছে।
আপনি কি জানেন, আপনার খাবার আপনার পাকস্থলীর স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি? -হ্যাঁ, আমরা কী খাই, কখন খাই এবং কত খাই, সবকিছুই আমাদের পাকস্থলীর স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। তাই, আসুন জেনে নিই একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শে কীভাবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে পাকস্থলীকে সুস্থ রাখতে পারি।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের গুরুত্ব
আমরা যা খাই, তা আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে প্রভাবিত করে। আর আমরা জানি, পেট খুব বেশি সংবেদনশীল। অতিরিক্ত মশলাদার খাবার, তৈলাক্ত খাবার, অ্যাসিডিক খাবার, কার্বনেটেড পানীয়, কফি, চা ইত্যাদি আমাদের পেটের জন্য ক্ষতিকর। এই খাবার গুলো পেটের অ্যাসিড বৃদ্ধি করে, হজম প্রক্রিয়া কে ধীর করে এবং বিভিন্ন ধরনের পেটের সমস্যা সৃষ্টি করে।
কী খাবেন?
আমাদের পেট হল শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খাদ্য হজম করে শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগান দেওয়ার কাজটি করে পেট। কিন্তু অনেকেরই পেটের নানা রকম সমস্যা থাকে। গ্যাস, অম্বল, কোষ্ঠকাঠিন্য, এসিডিটি ইত্যাদি সমস্যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিঘ্নিত করে তোলে।
তো এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের সঠিক খাবার খাওয়া জরুরি। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের পরামর্শ অনুযায়ী কোন খাবার গুলো খাওয়া উচিত তা জানব।
১.আঁশযুক্ত খাবার
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা সবচেয়ে বেশি জোর দেন আঁশযুক্ত খাবার খাবারের উপর। আঁশ হল এক ধরনের শর্করা যা আমাদের শরীর হজম করতে পারে না। তবে এটি পেটের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আঁশ পেটের ভিতরের খাবারকে সঠিকভাবে চলতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ফল, শাকসবজি, বাদাম, বীজ ইত্যাদি আঁশের ভাল উৎস।
২.প্রোটিনযুক্ত খাবার
প্রোটিন আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি শরীরের কোষ গঠনে সাহায্য করে, পেশীকে শক্তিশালী করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। বিশেষ করে পেটের সমস্যা থাকলে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া খুবই জরুরি।
৩.স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা সবচেয়ে বেশি জোর দেন স্বাস্থ্যকর চর্বি খাবারের উপর। স্বাস্থ্যকর চর্বি শুধু হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় না, এটি আমাদের পেটের জন্যও উপকারী। অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, বাদাম এই ধরনের স্বাস্থ্যকর খাবার চর্বির ভাল উৎস।
৪.পর্যাপ্ত পরিমান জল পান
জল হলো আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এটি হজমে সাহায্য করে এবং শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে। পানি শরীরে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে সাহায্য করে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। আর যখন ব্যায়াম বা গরম আবহাওয়া থাকবে তখন আরো বেশি জল পান করবেন।
৫.দই খাবেন
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা সুস্থ পেটের জন্য দই খাওয়ার পরামর্শ দেন। দইতে প্রচুর পরিমাণে প্রোবায়োটিক থাকে। এই প্রোবায়োটিক আমাদের পাকস্থলীতে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে। এই ব্যাকটেরিয়া গুলো আমাদের খাবার হজমে সাহায্য কর। পাশাপাশি অনেক ধরনের পেটের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে।
৬.মধু খাবেন
মধু শুধু মিষ্টি জাতীয় খাবার নয়, এটি পেটের জন্যও উপকারী। মধুতে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল থাকে, যা পেটের সংক্রমণ দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও, মধু হজম শক্তি বাড়াতে এবং পেটের আলসার নিরাময়ে সাহায্য করে। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা প্রায়ই পেটের সমস্যায় ভুগছেন এমন রোগীদের মধু খাওয়ার পরামর্শ দেন।
কী এড়িয়ে চলবেন?
আমরা সবাই জানি, সুস্থ থাকতে সুস্থ খাবার খাওয়া জরুরি। কিন্তু অনেক সময় আমরা স্বাদে মজা পেতে বা সুবিধার জন্য এমন অনেক খাবার খেয়ে ফেলি যা আমাদের পেটের জন্য ক্ষতিকর। চলুন এবার জেনে নেই গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট এর পরামর্শ অনুযায়ী কোন খাবার গুলো এড়িয়ে চলা উচিত।
১.মশলাদার খাবার
মশলাদার খাবারে থাকা ক্যাপসাইসিন নামক এক ধরনের যৌগ পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত অ্যাসিড পাকস্থলীর আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এসিডিটি, গ্যাস, পেট ফোলা, হার্টবার্ন ইত্যাদি সমস্যা সৃষ্টি করে। এছাড়াও, মশলাদার খাবার পাকস্থলীর পেশী গুলোকে উত্তেজিত করে এবং পেটে খিঁচুনি ও ব্যথা সৃষ্টি করে।
২.চর্বিযুক্ত খাবার
চর্বিযুক্ত খাবার হজম করতে অনেক সময় লাগে। ফলে, খাবার পাকস্থলীতে দীর্ঘক্ষণ থাকে এবং পাকস্থলীর উপর চাপ বাড়ায়। চর্বিযুক্ত খাবার পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড উৎপাদন করে, যা অ্যাসিডিটি এবং পেট ফোলার কারণ হিসেবে ধরা হয়।
চর্বিযুক্ত খাবারে ক্যালোরি বেশি থাকে, যা আমাদের শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে। অতিরিক্ত ওজন অনেক ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা, (যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ) ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৩.কার্বনেটেড পানীয়
কার্বনেটেড পানীয় গুলোতে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস মিশ্রিত থাকে, যা পানীয়কে ফিজ়ি করে তোলে। যা আমাদের পেটে প্রবেশ করে আরো বেশি গ্যাস তৈরি করে। ফলে পেট ফাঁপা, বদহজম, অ্যাসিডিটি, বমি বমি ভাব ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
৪. অতিরিক্ত শক্ত খাবার
শক্ত খাবার হজম করতে আমাদের শরীরকে বেশি সময় নিতে হয়। ফলে, খাবার পাকস্থলীতে বেশিক্ষণ থাকে। এরফলে সেই খাবার গুলোতে পচন ধরে। আর শক্ত খাবার হজম করার সময় পাকস্থলীর পেশী গুলোকে বেশি কাজ করতে হয়।
যার ফলস্বরুপ, পাকস্থলীতে চাপ বাড়তে পারে এবং অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দেয়। শক্ত খাবার হজমের সমস্যা ছাড়াও কবজি, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং গ্যাসের সমস্যাও সৃষ্টি করে।
৫.অ্যালকোহল
অ্যালকোহল পাকস্থলীর আস্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে এসিডিটি বেড়ে যায়। সেজন্য অনেকের আলসারের মতো গুরুতর সমস্যা হয়। অ্যালকোহল হজম প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং পেটে অতিরিক্ত এসিড উৎপাদন বাড়িয়ে তোলে। অ্যালকোহল যকৃতের ক্ষতি করে, যার ফলে হজম শক্তি কমে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের হজমের সমস্যা দেখা দেয়।
৬.প্রক্রিয়াজাত খাবার
প্রক্রিয়াজাত খাবার আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অতি পরিচিত। কিন্তু এই খাবার গুলোতে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম, চিনি এবং সংরক্ষক থাকে, যা আমাদের পেটের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই খাবার গুলোতে প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ কম থাকে এবং কৃত্রিম উপাদান বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞ ডাঃ "প্রফেসর ডাঃ. মোঃ আব্দুর রহিম মিয়া" এর পরামর্শ
(খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পদ্ধতি)
আধুনিক জীবনযাত্রা এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ আমাদের খাদ্যাভ্যাসকে অনেকটা নষ্ট করে দিয়েছে। ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, মিষ্টি এবং চর্বিযুক্ত খাবার আমাদের ডায়েটের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে। এগুলি আমাদের শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি, চর্বি এবং শর্করা যোগায়, যার ফলে ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।
তবে প্রথম অবস্থায় আপনার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার বিষয়টা কঠিন মনে হবে। কিন্তুু যদি আপনি নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেন তাহলে আপনার ক্ষেত্রেও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা সহজ মনে হবে। আর এই কাজটি সহজভাবে করার জন্য নিচের পদ্ধতি গুলো ফলো করবেন। যেমন,
- ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
- একবারে সবকিছু পরিবর্তন করার চেষ্টা করবেন না।
- স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকা তৈরি করবেন।
- ঘন ঘন খাবার খাওয়ার অভ্যাস করবেন।
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ জল পান করবেন।
- নিয়মিত ব্যায়াম অথবা পরিশ্রম করবেন।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন একটি সুস্থ জীবন যাপনের অন্যতম পদ্ধতি। একবার এই পদ্ধতি গড়ে উঠলে, আপনি সারাজীবন সুস্থ থাকতে পারবেন। আর যদি আপনার সময় হয় তাহলে নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
সিরিয়াল ও ইনফরমেশন এর জন্য কল করুন - 01902991500 (সকাল ১০:০০ টা হতে রাত ০১০:০০ টা, শুক্রবার ব্যাতিত)
অধ্যাপক ডাঃ কানু বালা
লিভার, মেডিসিন ও পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ
এমবিবিএস, পিএইচডি (ঢাবি), পিএইচডি (ইউএসটিসি) এফআরসিপি (ডাবলিন), এফআরসিপি (এডিনবার্গ) ফেলো অব আমেরিকা কলেজ অব প্যাসট্রোএন্টারোলজি
প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স এন্ড টেকনোলোজি (ইউএসটিসি)
চেম্বারের ঠিকানা: ১,২,৩, বিএনএসবি ভবন, কলওয়ালাপাড়া, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬ । (সনি সিনেমা হলের বিপরীতে)
সিরিয়াল ও ইনফরমেশন এর জন্য কল করুন - 01902991500 (সকাল ১০:০০ টা হতে রাত ০১০:০০ টা, শুক্রবার ব্যাতিত)
পরিশেষে কিছুকথা
আমরা সবাই জানি, সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট এর গুরুত্ব অনেক। তাই আপনি যদি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার মাধ্যমে নিজেকে সুস্থ রাখতে চান তারা আজকের নিয়ম গুলো ফলো করবেন। আর নিজেকে সর্বদা ফিট রাখার জন্য আমাদের ব্লগে পাবলিশ করা কন্টেন্ট গুলো পড়বেন। ধন্যবাদ।